আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ঢাকা নেশন
ভেনেজুয়েলায় পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের কয়েকদিন পরও ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধারে চলছে সময়ের সঙ্গে লড়াই। কোথাও খালি হাতে, কোথাও কোদাল দিয়ে কংক্রিট সরিয়ে চলছে উদ্ধার অভিযান। আকাশে উড়ছে ড্রোন—ধ্বংসস্তূপের নিচে কোনো জীবিত মানুষের সন্ধান মিলছে কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
রাজধানী কারাকাস সংলগ্ন উপকূলীয় প্রদেশ লা গুয়াইরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি। বিধ্বস্ত ভবনের স্তূপের পাশে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে আছেন স্বজনরা। কেউ কানে শুনতে চেষ্টা করছেন কোনো শব্দ ভেসে আসে কি না, আবার কেউ ভাঙা ইট-পাথরের ফাঁক দিয়ে প্রিয়জনের কোনো চিহ্ন খুঁজছেন।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার দুটি ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার ৪৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে। জাতিসংঘের প্রাথমিক মূল্যায়নে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ নিখোঁজ বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। শত শত ভবন ধসে পড়ায় নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন উদ্ধারকর্মীরা।
উদ্ধারকর্মীর চেয়ে অপেক্ষমাণ মানুষের সংখ্যা বেশি
মেক্সিকো, স্পেন, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশ থেকে উদ্ধারকারী দল ভেনেজুয়েলায় পৌঁছালেও ক্ষয়ক্ষতির তুলনায় জনবল এখনও অনেক কম।
দুর্যোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূমিকম্পের পর প্রথম ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা জীবিত মানুষ উদ্ধারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। তবে ধ্বংসস্তূপের নিচে যদি খাদ্য ও পানির সামান্য সুযোগও থাকে, তাহলে সেই সময়সীমা কিছুটা বাড়তে পারে।
দেশটির জাতীয় পরিষদের প্রেসিডেন্ট হোর্হে রদ্রিগেজ বলেন, “যে প্রতিটি মানুষকে জীবিত উদ্ধার করা যাচ্ছে, সেটিই অলৌকিক ঘটনা।”
ছেলেকে খুঁজতে ২০০ কিলোমিটার পথ
উপকূলীয় শহর কাতিয়া লা মারে ধসে পড়া একটি ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন জেসুস সুয়ারেজ। প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূর থেকে তিনি এসেছেন নিখোঁজ ছেলে জিন সুয়ারেজের খোঁজে।
তার ভাষায়, এখন পর্যন্ত ছেলের কোনো খোঁজ মেলেনি। স্থানীয়দের কাছ থেকেও নিশ্চিত কোনো তথ্য পাননি। তিনি বিশ্বাস করেন, ধসে পড়া ভবনের নিচেই আটকে আছেন তার ছেলে।
কিন্তু ভারী যন্ত্রপাতির অভাবে উদ্ধারকাজ এগোচ্ছে ধীরগতিতে। তার মতে, শুধুমাত্র মানুষের হাত দিয়ে এত বড় কংক্রিটের স্তূপ সরানো সম্ভব নয়।
ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে ভেসে আসে গোঙানির শব্দ
আরেকটি ভবনের নিচে আটকে আছেন ৩১ বছর বয়সী কার্লোস এদুয়ার্দো। পরিবারের সদস্যরা জানান, কিছুক্ষণ পরপর তার গোঙানির শব্দ শোনা যাচ্ছিল।
স্বজনরা বারবার তার নাম ধরে ডাকছিলেন। একসময় তিনি সাড়া দিলেও পরে আবার নীরব হয়ে যান। এরপর থেকে আর কোনো শব্দ পাওয়া যায়নি। তবুও পরিবারের সদস্যরা আশা ছাড়ছেন না।
উদ্ধারকর্মীরা অনেক সময় সবাইকে সম্পূর্ণ নীরব থাকতে অনুরোধ করছেন, যাতে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে আসা ক্ষীণ শব্দও শোনা যায়।
ড্রোনে চলছে নিখোঁজদের খোঁজ
অনেক এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দারাই নিজেদের ড্রোন ব্যবহার করে ধ্বংসস্তূপের ছবি সংগ্রহ করছেন।
ড্রোনের ভিডিওতে পরিবারের সদস্যরা খুঁজে ফিরছেন পরিচিত কোনো কাপড়, ব্যক্তিগত জিনিস বা অন্য কোনো চিহ্ন, যা নিখোঁজ স্বজনের অবস্থান সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে।
বাড়ছে দুর্গন্ধ, বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মরদেহ থেকে দুর্গন্ধ ছড়াতে শুরু করেছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, এতে সংক্রামক রোগ ছড়ানোর ঝুঁকিও বাড়ছে।
বাসিন্দাদের অভিযোগ, অনেক এলাকায় এখনও পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তা পৌঁছায়নি। তবে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে স্বেচ্ছাসেবীরা খাদ্য, পানি ও জরুরি সহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসছেন।
গাড়িতেই কাটছে রাত
২৮ বছর বয়সী আলেক্সান্দ্রা গাবিনো জানান, ভূমিকম্পের সময় তিনি স্বামী ও দুই সন্তানকে নিয়ে গাড়িতে ছিলেন। মুহূর্তের মধ্যে পাশের ভবন ধসে পড়লে তারা অল্পের জন্য রক্ষা পান।
এখন তারা ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িতে ফিরতে পারছেন না। নিরাপদ আশ্রয়ের অভাবে বিমানবন্দরের খোলা জায়গায় নিজেদের গাড়িতেই রাত কাটাচ্ছেন।
তার স্বামী ঝুঁকি নিয়ে মাঝে মাঝে ভবনে ঢুকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও কিছু জরুরি জিনিসপত্র বের করার চেষ্টা করছেন।
আলেক্সান্দ্রা বলেন, সবকিছু হারিয়ে ফেলার কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। মানুষ বলে বেঁচে থাকাটাই সবচেয়ে বড় বিষয়—সেটা সত্যি। কিন্তু চারদিকে মানুষের আর্তনাদ, ধ্বংসস্তূপে আটকে থাকা শিশুদের কান্না আর অসহায় মানুষের চিত্র দেখে শক্ত থাকা খুব কঠিন।
আন্তর্জাতিক সহায়তা বাড়ছে
ভেনেজুয়েলার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিভিন্ন দেশ থেকে শত শত উদ্ধারকর্মী ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছেন এবং আরও সহায়তা আসছে। উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকলেও প্রতিটি ঘণ্টা পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জীবিত কাউকে উদ্ধারের সম্ভাবনা কমে যাচ্ছে।
তবুও স্বজনদের আশা এখনও শেষ হয়ে যায়নি। ধ্বংসস্তূপের পাশে দাঁড়িয়ে তারা অপেক্ষা করছেন—হয়তো পরবর্তী উদ্ধার হওয়া মানুষটিই হবে তাদের প্রিয়জন।
Reporter Name 









