Dhaka 3:31 pm, Wednesday, 4 November 2026
News Title :
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে ঘিরে ‘ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের’ চেষ্টা চলছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অস্ত্রসহ গ্রেপ্তারের পর যুবদল নেতা বহিষ্কার ফ্রান্সকে উড়িয়ে বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেন বিএনপি ও জামায়াত একদল, দাবি জি এম কাদেরের আ. লীগের বিচার শুরু, সীমান্তে ঢুকলেই গ্রেপ্তার: আইনমন্ত্রী শিক্ষার্থীদের স্বার্থে যেকোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে: মাহদী আমিন শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবিতে দেশজুড়ে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ জয় চান ট্রাম্পের প্রতিনিধি ইতিহাসের সবচেয়ে দামী সেমিফাইনাল আজ সেমিফাইনালে উঠেছে ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ চার দল। সম্ভাব্য চার দ্বৈরথ ঘিরে ফুটবল বিশ্বে উত্তেজনা
প্রয়াত শেখ হামাদ: যেভাবে আধুনিক কাতারকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন সাবেক আমির

প্রয়াত শেখ হামাদ: কীভাবে আধুনিক কাতারকে বিশ্বশক্তিতে রূপ দেন সাবেক আমির

প্রয়াত কাতারের সাবেক আমির শেখ হামাদ: আধুনিক কাতারের রূপকারের বিদায়

কাতারের সাবেক আমির শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানি আর নেই। রোববার কাতারের আমিরের কার্যালয় তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর। বর্তমান আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির বাবা হিসেবে তিনি শুধু রাজপরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যই নন, আধুনিক কাতার গঠনের অন্যতম প্রধান স্থপতি হিসেবেও বিশ্বজুড়ে পরিচিত।

রাজধানী দোহার ইমাম মুহাম্মদ ইবন আবদ আল-ওয়াহাব মসজিদে মাগরিবের নামাজের পর সরল আয়োজনে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে বর্তমান আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি ও পরিবারের সদস্যরা মরদেহ বহন করেন। দোহার উত্তরে লুসাইল কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

আধুনিক কাতারের ভিত্তি নির্মাতা

১৯৯৫ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর শেখ হামাদ কাতারের উন্নয়নের নতুন অধ্যায় শুরু করেন। ছোট ভৌগোলিক আয়তনের দেশটি যাতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারে, সে লক্ষ্যেই তিনি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেন।

তাঁর নেতৃত্বে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, জ্বালানি এবং ক্রীড়া খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ করা হয়। বিশেষ করে প্রাকৃতিক গ্যাস সম্পদের কার্যকর ব্যবহার কাতারের অর্থনীতিকে দ্রুত সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যায় এবং দেশটি বিশ্বের অন্যতম ধনী রাষ্ট্রে পরিণত হয়।

সফট পাওয়ারে গুরুত্ব

শেখ হামাদ বিশ্বাস করতেন, শুধু সামরিক শক্তি নয়; শিক্ষা, কূটনীতি, মানবিক সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও একটি দেশের বৈশ্বিক প্রভাব বাড়াতে পারে। তাই তিনি কাতারের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে সফট পাওয়ারকে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন।

তাঁর সময়ে কাতার আন্তর্জাতিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গবেষণা প্রকল্প, ক্রীড়া আয়োজন এবং মানবিক সহায়তায় বড় ধরনের বিনিয়োগ করে বিশ্বজুড়ে নিজেদের পরিচিতি বাড়ায়।

আঞ্চলিক কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা

শেখ হামাদের শাসনামলে কাতার মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বিভিন্ন সংঘাত নিরসনে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

২০০৮ সালে লেবাননের রাজনৈতিক সংকট নিরসনে দোহা চুক্তি সম্পাদনে সহায়তা করে কাতার। এছাড়া সুদানের দারফুর সংকট নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে ২০১১ সালে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরে সহায়তা করে দেশটি।

ফিলিস্তিনের বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে সংলাপ, ইয়েমেন, সোমালিয়া, ইরিত্রিয়া ও জিবুতির বিভিন্ন বিরোধে মধ্যস্থতার ক্ষেত্রেও কাতারের সক্রিয় ভূমিকা আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসিত হয়।

কৌশলগত ভারসাম্যের নীতি

শেখ হামাদের সময়েই কাতারে প্রতিষ্ঠিত হয় আল-উদেইদ সামরিক ঘাঁটি, যা বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বৃহৎ সামরিক ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।

একই সময়ে দোহায় ফিলিস্তিনি সংগঠন হামাসের রাজনৈতিক নেতৃত্বের উপস্থিতিও কাতারের কূটনৈতিক নীতির অংশ ছিল। বিশ্লেষকদের মতে, বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখে মধ্যস্থতার সক্ষমতা ধরে রাখাই ছিল কাতারের কৌশল।

ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন

২০১২ সালে গাজা সফরকারী প্রথম আরব নেতা ছিলেন শেখ হামাদ। ওই সফরে তিনি গাজার পুনর্গঠন ও আবাসন উন্নয়নের জন্য প্রায় ৪০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সহায়তার ঘোষণা দেন।

ফিলিস্তিন ইস্যুতে কাতার দীর্ঘদিন ধরেই মানবিক সহায়তা ও কূটনৈতিক উদ্যোগ অব্যাহত রেখেছে।

ক্ষমতা হস্তান্তরের নজির

২০১৩ সালে শেখ হামাদ স্বেচ্ছায় ক্ষমতা তাঁর ছেলে শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির কাছে হস্তান্তর করেন। মধ্যপ্রাচ্যের রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এটি ছিল তুলনামূলক বিরল একটি ঘটনা।

বর্তমান আমির শেখ তামিম দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে তাঁর বাবার গড়ে দেওয়া নীতির অনুসরণ করে কাতারকে আরও এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।

উত্তরাধিকার

শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানির নেতৃত্বে কাতার একটি ছোট উপসাগরীয় রাষ্ট্র থেকে আন্তর্জাতিক কূটনীতি, জ্বালানি অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক প্রভাবের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়। তাঁর উন্নয়ন দর্শন, দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং কৌশলগত সিদ্ধান্ত আধুনিক কাতারের ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

তাঁর মৃত্যুতে কাতার শুধু একজন সাবেক শাসককেই হারায়নি, বরং হারিয়েছে আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের এক দূরদর্শী স্থপতিকে।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে ঘিরে ‘ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের’ চেষ্টা চলছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

প্রয়াত শেখ হামাদ: যেভাবে আধুনিক কাতারকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন সাবেক আমির

প্রয়াত শেখ হামাদ: কীভাবে আধুনিক কাতারকে বিশ্বশক্তিতে রূপ দেন সাবেক আমির

Update Time : 07:42:15 pm, Monday, 13 July 2026

প্রয়াত কাতারের সাবেক আমির শেখ হামাদ: আধুনিক কাতারের রূপকারের বিদায়

কাতারের সাবেক আমির শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানি আর নেই। রোববার কাতারের আমিরের কার্যালয় তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর। বর্তমান আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির বাবা হিসেবে তিনি শুধু রাজপরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যই নন, আধুনিক কাতার গঠনের অন্যতম প্রধান স্থপতি হিসেবেও বিশ্বজুড়ে পরিচিত।

রাজধানী দোহার ইমাম মুহাম্মদ ইবন আবদ আল-ওয়াহাব মসজিদে মাগরিবের নামাজের পর সরল আয়োজনে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে বর্তমান আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি ও পরিবারের সদস্যরা মরদেহ বহন করেন। দোহার উত্তরে লুসাইল কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

আধুনিক কাতারের ভিত্তি নির্মাতা

১৯৯৫ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর শেখ হামাদ কাতারের উন্নয়নের নতুন অধ্যায় শুরু করেন। ছোট ভৌগোলিক আয়তনের দেশটি যাতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারে, সে লক্ষ্যেই তিনি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেন।

তাঁর নেতৃত্বে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, জ্বালানি এবং ক্রীড়া খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ করা হয়। বিশেষ করে প্রাকৃতিক গ্যাস সম্পদের কার্যকর ব্যবহার কাতারের অর্থনীতিকে দ্রুত সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যায় এবং দেশটি বিশ্বের অন্যতম ধনী রাষ্ট্রে পরিণত হয়।

সফট পাওয়ারে গুরুত্ব

শেখ হামাদ বিশ্বাস করতেন, শুধু সামরিক শক্তি নয়; শিক্ষা, কূটনীতি, মানবিক সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও একটি দেশের বৈশ্বিক প্রভাব বাড়াতে পারে। তাই তিনি কাতারের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে সফট পাওয়ারকে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন।

তাঁর সময়ে কাতার আন্তর্জাতিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গবেষণা প্রকল্প, ক্রীড়া আয়োজন এবং মানবিক সহায়তায় বড় ধরনের বিনিয়োগ করে বিশ্বজুড়ে নিজেদের পরিচিতি বাড়ায়।

আঞ্চলিক কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা

শেখ হামাদের শাসনামলে কাতার মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বিভিন্ন সংঘাত নিরসনে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

২০০৮ সালে লেবাননের রাজনৈতিক সংকট নিরসনে দোহা চুক্তি সম্পাদনে সহায়তা করে কাতার। এছাড়া সুদানের দারফুর সংকট নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে ২০১১ সালে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরে সহায়তা করে দেশটি।

ফিলিস্তিনের বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে সংলাপ, ইয়েমেন, সোমালিয়া, ইরিত্রিয়া ও জিবুতির বিভিন্ন বিরোধে মধ্যস্থতার ক্ষেত্রেও কাতারের সক্রিয় ভূমিকা আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসিত হয়।

কৌশলগত ভারসাম্যের নীতি

শেখ হামাদের সময়েই কাতারে প্রতিষ্ঠিত হয় আল-উদেইদ সামরিক ঘাঁটি, যা বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বৃহৎ সামরিক ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।

একই সময়ে দোহায় ফিলিস্তিনি সংগঠন হামাসের রাজনৈতিক নেতৃত্বের উপস্থিতিও কাতারের কূটনৈতিক নীতির অংশ ছিল। বিশ্লেষকদের মতে, বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখে মধ্যস্থতার সক্ষমতা ধরে রাখাই ছিল কাতারের কৌশল।

ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন

২০১২ সালে গাজা সফরকারী প্রথম আরব নেতা ছিলেন শেখ হামাদ। ওই সফরে তিনি গাজার পুনর্গঠন ও আবাসন উন্নয়নের জন্য প্রায় ৪০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সহায়তার ঘোষণা দেন।

ফিলিস্তিন ইস্যুতে কাতার দীর্ঘদিন ধরেই মানবিক সহায়তা ও কূটনৈতিক উদ্যোগ অব্যাহত রেখেছে।

ক্ষমতা হস্তান্তরের নজির

২০১৩ সালে শেখ হামাদ স্বেচ্ছায় ক্ষমতা তাঁর ছেলে শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির কাছে হস্তান্তর করেন। মধ্যপ্রাচ্যের রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এটি ছিল তুলনামূলক বিরল একটি ঘটনা।

বর্তমান আমির শেখ তামিম দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে তাঁর বাবার গড়ে দেওয়া নীতির অনুসরণ করে কাতারকে আরও এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।

উত্তরাধিকার

শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানির নেতৃত্বে কাতার একটি ছোট উপসাগরীয় রাষ্ট্র থেকে আন্তর্জাতিক কূটনীতি, জ্বালানি অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক প্রভাবের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়। তাঁর উন্নয়ন দর্শন, দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং কৌশলগত সিদ্ধান্ত আধুনিক কাতারের ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

তাঁর মৃত্যুতে কাতার শুধু একজন সাবেক শাসককেই হারায়নি, বরং হারিয়েছে আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের এক দূরদর্শী স্থপতিকে।