ঢাকা নেশন ডেস্ক: এক বছর বা তার বেশি সময় ধরে নিয়মিত ও অসুরক্ষিত দাম্পত্য জীবনের পরও গর্ভধারণ না হলে তাকে বন্ধ্যত্ব (ইনফার্টিলিটি) বলা হয়। তবে নারীর বয়স যদি ৩৫ বছরের বেশি হয়, তাহলে ছয় মাস চেষ্টা করার পরও গর্ভধারণ না হলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর জুন মাস ‘বন্ধ্যত্ব সচেতনতা মাস’ হিসেবে পালন করা হয়। এর উদ্দেশ্য হলো বন্ধ্যত্ব সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, ভুল ধারণা দূর করা এবং সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণে মানুষকে উৎসাহিত করা।
বন্ধ্যত্বের জন্য কে বেশি দায়ী?
অনেকেই মনে করেন বন্ধ্যত্ব শুধু নারীর সমস্যা। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ক্ষেত্রে সমস্যার উৎস নারী, এক-তৃতীয়াংশ ক্ষেত্রে পুরুষ এবং বাকি এক-তৃতীয়াংশ ক্ষেত্রে উভয়ের সমস্যা বা অজানা কারণ দায়ী।
নারীদের বন্ধ্যত্বের প্রধান কারণ
১. ডিম্বাণু নিঃসরণে সমস্যা
প্রতি মাসে ডিম্বাশয় থেকে একটি পরিপক্ব ডিম্বাণু নিঃসৃত হওয়া স্বাভাবিক প্রজননের জন্য অপরিহার্য। এই প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটলে গর্ভধারণে সমস্যা দেখা দিতে পারে।
এর সাধারণ কারণগুলো হলো:
- পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (PCOS)
- থাইরয়েড হরমোনের ভারসাম্যহীনতা
- প্রোল্যাকটিন হরমোনের অতিরিক্ত মাত্রা
- অতিরিক্ত মানসিক চাপ
- অপুষ্টি
২. ফেলোপিয়ান টিউব বন্ধ হয়ে যাওয়া
ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর মিলন সাধারণত ফেলোপিয়ান টিউবে ঘটে। এই টিউব আংশিক বা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেলে গর্ভধারণ সম্ভব হয় না।
এর কারণ হতে পারে:
- পেলভিক সংক্রমণ
- যৌনবাহিত রোগ
- এন্ডোমেট্রিওসিস
- জননাঙ্গের যক্ষ্মা
৩. এন্ডোমেট্রিওসিস
জরায়ুর ভেতরের আবরণের মতো টিস্যু জরায়ুর বাইরে বৃদ্ধি পেলে ডিম্বাশয়, ফেলোপিয়ান টিউব ও আশপাশের অঙ্গে প্রদাহ এবং আঠালো অবস্থা তৈরি হয়। এতে স্বাভাবিকভাবে গর্ভধারণ বাধাগ্রস্ত হয়।
৪. জরায়ুর বিভিন্ন সমস্যা
নিম্নোক্ত সমস্যাগুলোও বন্ধ্যত্বের কারণ হতে পারে:
- ফাইব্রয়েড
- জন্মগত জরায়ুর ত্রুটি
- এন্ডোমেট্রিয়াল পলিপ
- আশারম্যান সিনড্রোম
৫. বয়সের প্রভাব
নারীর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিম্বাণুর সংখ্যা ও গুণগত মান কমতে থাকে। বিশেষ করে ৪০ বছরের পর স্বাভাবিকভাবে গর্ভধারণের সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়।
জীবনযাত্রার যেসব অভ্যাস ঝুঁকি বাড়ায়
- অতিরিক্ত ওজন বা অত্যন্ত কম ওজন
- ধূমপান
- মাদকাসক্তি
- অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ
- দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ
- পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব
- পরিবেশ দূষণ ও বিষাক্ত রাসায়নিকের সংস্পর্শ
বন্ধ্যত্বের চিকিৎসা ও করণীয়
বর্তমানে বন্ধ্যত্বের অধিকাংশ কারণেরই কার্যকর চিকিৎসা রয়েছে। তাই সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞরা যেসব বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেন:
- সুষম খাদ্য গ্রহণ
- নিয়মিত ব্যায়াম
- ওজন নিয়ন্ত্রণ
- ধূমপান ও মাদক বর্জন
- পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা
- মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ
প্রয়োজনে ওষুধের মাধ্যমে ডিম্বাণু উৎপাদন ও নিঃসরণ স্বাভাবিক করা যায়। এছাড়া ফাইব্রয়েড, পলিপ, এন্ডোমেট্রিওসিস কিংবা ফেলোপিয়ান টিউবের কিছু সমস্যা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে চিকিৎসা করা সম্ভব।যেসব দম্পতির ক্ষেত্রে প্রয়োজন হয়, তাদের জন্য ইন্ট্রা ইউটেরাইন ইনসেমিনেশন (IUI) পদ্ধতিতে বিশেষভাবে প্রস্তুত করা শুক্রাণু সরাসরি জরায়ুতে প্রবেশ করানো হয়।
আর অন্যান্য চিকিৎসায় সফলতা না এলে ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন (IVF) একটি কার্যকর বিকল্প। এ পদ্ধতিতে শরীরের বাইরে ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর মিলনে ভ্রূণ তৈরি করে পরে তা জরায়ুতে প্রতিস্থাপন করা হয়।
সচেতনতাই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ
বন্ধ্যত্ব কোনো লজ্জার বিষয় নয়, এটি একটি চিকিৎসাযোগ্য স্বাস্থ্যসমস্যা। সময়মতো রোগ নির্ণয়, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে অনেক দম্পতিই সফলভাবে সন্তান লাভ করতে পারেন। তাই দীর্ঘদিন গর্ভধারণ না হলে দেরি না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
Choiti Saha 











