আন্তর্জাতিক ডেস্ক | Dhaka Nation
মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ব্যক্তিগত আর্থিক স্বার্থ থেকে দূরে থাকার যে অলিখিত নীতি বহু দশক ধরে অনুসরণ করে আসছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের নেতারা, ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক আর্থিক তথ্য সেই প্রথাকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। প্রকাশিত সর্বশেষ আর্থিক বিবরণীতে দেখা গেছে, হোয়াইট হাউসে দ্বিতীয় মেয়াদে ফেরার প্রথম বছরেই বিভিন্ন ব্যবসা থেকে বিপুল পরিমাণ আয় করেছেন তিনি।
মার্কিন ইতিহাসে আগের প্রেসিডেন্টদের মধ্যে ব্যক্তিগত ব্যবসা ও সরকারি দায়িত্বের মধ্যে স্পষ্ট দূরত্ব বজায় রাখার বহু উদাহরণ রয়েছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান দায়িত্ব ছাড়ার পর সামরিক পেনশন ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোনো ব্যক্তিগত আয় করেননি। অন্যদিকে জর্জ ডব্লিউ বুশ প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার আগেই নিজের বিনিয়োগ একটি ‘ব্লাইন্ড ট্রাস্ট’-এর অধীনে হস্তান্তর করেছিলেন, যাতে সরকারি সিদ্ধান্তের সঙ্গে ব্যক্তিগত আর্থিক স্বার্থের সংঘাত তৈরি না হয়।
কিন্তু ট্রাম্পের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। নতুন আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিভিন্ন ব্যবসায়িক কার্যক্রম থেকে তাঁর মোট আয় প্রায় ২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ইতিহাসবিদদের মতে, দায়িত্বে থাকা কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের ক্ষেত্রে এমন আর্থিক প্রবৃদ্ধির নজির অতীতে দেখা যায়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস এখন ক্রিপ্টোকারেন্সি-ভিত্তিক ব্যবসা। সরকারি নথি অনুযায়ী, ডিজিটাল সম্পদ ও সংশ্লিষ্ট প্রকল্প থেকেই তিনি প্রায় ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার আয় করেছেন।
বার্ষিক আর্থিক বিবরণীতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ট্রাম্প ও তাঁর পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ক্রিপ্টো প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়াল থেকে শত শত কোটি ডলারের আয় এসেছে। ক্রিপ্টো টোকেন বিক্রি, প্রতিষ্ঠানের শেয়ার বিক্রি এবং বিভিন্ন ডিজিটাল সম্পদ লেনদেনের মাধ্যমে এই অর্থ অর্জিত হয়েছে।
এ ছাড়া ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডের নামে চালু করা ‘ট্রাম্প মেমে কয়েন’ থেকেও কয়েকশ কোটি ডলার আয় হয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। গত বছরের তুলনায় ক্রিপ্টো ব্যবসা থেকে তাঁর আয় কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা এই খাতের দ্রুত সম্প্রসারণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু নীতি ও উদ্যোগ ক্রিপ্টোকারেন্সি শিল্পের জন্য ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করেছে। সমালোচকদের দাবি, এখানেই সরকারি নীতি ও ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক স্বার্থের সম্ভাব্য সংঘাত নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
ক্রিপ্টো ব্যবসার বাইরে আইনি সমঝোতা, বিদেশে ট্রাম্প ব্র্যান্ড ব্যবহারের লাইসেন্স এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক চুক্তি থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ আয় করেছেন ট্রাম্প। পাশাপাশি তাঁর মালিকানাধীন গলফ কোর্স, বিলাসবহুল রিসোর্ট এবং হোটেল ব্যবসা থেকেও কয়েকশ কোটি ডলারের রাজস্ব এসেছে।
বিশেষ করে ফ্লোরিডার মার-এ-লাগো রিসোর্ট এবং ওয়েস্ট পাম বিচের গলফ ক্লাবের আয় আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অন্যান্য সম্পত্তি থেকে আয়ের গতি তুলনামূলক ধীর ছিল বলে আর্থিক বিবরণীতে উল্লেখ করা হয়েছে।
নথিতে আরও দেখা যায়, গত বছর ট্রাম্প একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ৫ কোটি ডলারের বেশি ঋণ নিয়েছেন। যদিও সেই ঋণের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
হোয়াইট হাউস অবশ্য ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ওঠা স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র অ্যানা কেলির দাবি, ট্রাম্প ও তাঁর পরিবার এমন কোনো কর্মকাণ্ডে জড়িত নন, যা সরকারি দায়িত্ব পালনে স্বার্থের সংঘাত সৃষ্টি করতে পারে। তাঁর ভাষ্য, প্রশাসনের নেওয়া প্রতিটি সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের স্বার্থ বিবেচনায় গ্রহণ করা হয়েছে।
তবে ইতিহাসবিদ ও সুশাসন বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, দায়িত্বে থাকা অবস্থায় প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত ব্যবসা থেকে এত বড় অঙ্কের আয় ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি নৈতিকতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে বিতর্ক আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। তাঁদের মতে, সরকারি ক্ষমতা, ব্যক্তিগত ব্যবসা এবং আর্থিক স্বার্থের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হওয়ার এটিই অন্যতম বড় কারণ।
Sabrina Jabin 















